নষ্ট হচ্ছে চাষের জমি, ফলন কমছে দিন দিন
“চাহিদা থাকায় মাঠে থাকা অবস্থাতেই প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকার মুলা বিক্রিও করেছিলাম। পরে ক্রেতাকে সে দাম আবার ফেরত দিতে হয়েছে। শুধু এক মাঠেই আমার সাড়ে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
শুধু মো. সুজনের জমি নয়, বরং ‘নীরব ঘাতকের’ মতো বাড়ছে অ্যাসিড বা অম্ল মান বাড়ছে কুমিল্লাসহ চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষি জমিতেও।
এর মধ্যে কুমিল্লা জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে অ্যাসিডের ক্ষতিকর পরিমাণ বেড়েছে, তার মধ্যে চার উপজেলার শতভাগ জমি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানালেন কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, কৃষি সমৃদ্ধ এলাকা কুমিল্লা জেলার সদর উপজেলা, লাকসাম, বরুড়া ও লালমাই উপজেলার প্রায় শতভাগ জমিতে অ্যাসিডের পরিমাণ বিপদজনক হারে বেড়েছে। পুরো জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমি এই রোগে আক্রান্ত। যে কারণে বেশি খরচ করে ফসলের চাষ করেও আশানুরূপ উৎপাদন পাচ্ছেন না কৃষকরা।
তবে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যে অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ছে তার জন্য কৃষকের অসচেতনতাকেই দায়ী করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, জৈব সারের ব্যবহার ছাড়া একই জমিতে একাধিক মৌসুমের ফলন করতে গিয়ে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে এই দশার সৃষ্টি হয়েছে।
মাটি ও সার গবেষকরা বলছেন, আবাদি জমিতে পিএইচ বা পটেনশিয়াল হাইড্রোজেনের মান ৫ দশমিক ৫ এর নিচে নেমে আসা আশানুরূপ ফলন উৎপাদনের জন্য শঙ্কার বিষয়।
তারা বলছেন, অ্যাসিড বা অম্ল মান বেড়ে গেলে সার দিলেও মাটি থেকে গাছ পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না। আর এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
গত মৌসুমে কুমিল্লায় এক লাখ ৯৪ হাজার ১২২ হেক্টর জমিতে চার লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৫ টন আমন ধান এবং ৫৬ হাজার ২৪৭ টন সবজি উৎপাদন হয়েছে। যদি মাটির গুণাগুন ঠিক না থাকে তাহলে এ বছর উৎপাদনের পরিমাণ কমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
কুমিল্লা জেলার মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের ৯৩ শতাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলের অন্তত ৪৭ শতাংশ মাটিতে অ্যাসিডের মান বেড়ে গেছে। এই অঞ্চলটিতে ৯৭ শতাংশ মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি, ৮৬ শতাংশ মাটিতে ফসফরাসের ঘাটতি, ৮৯ শতাংশ মাটিতে পটাসিয়ামের ঘাটতি এবং ৬৬ শতাংশ মাটিতে সালফারের ঘাটতি রয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই তিন জেলার ১৮ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে খুবই শক্তিশালীভাবে অ্যাসিডের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ ছাড়া দুই লাখ ৭৬ হাজার ২৮৬ হেক্টর জমিতে পিএইচ এর মান ৪ দশমিক ৫ ছুঁয়েছে। অর্থাৎ এসব জমিতে আশানুরূপ ফলন পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়।”
সদর উপজেলার আমতলী গোমতীর চরের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা আসলেই বুঝি না। এত সার দেই, এত পরিচর্যা তাও কেন ফসল পাই না। আমাদের এই জমিগুলোতে এক বছরে একাধিক ফলন হয়। হঠাৎ যদি ফলন না হয় তাহলে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।”
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বলেন, “আমরা কৃষকদের মাটি পরীক্ষার জন্য বলছি এবং আমরাও মাটি পরীক্ষার জন্য মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। কৃষকদের মাটি পরীক্ষার পর মাটিতে নিয়ম মেনে সার ব্যবহারের পরামর্শ দেই আমরা।”
সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ কবির খান বলেন, “দীর্ঘদিন কৃষি জমিতে একটানা রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে এই অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এজন্য আমরা খুব সহজ একটি উপায় কৃষকদের বলে থাকি। যে, আপনারা জমি চাষের পূর্বে ডলোচুন ব্যবহার করুন।”
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, “কৃষক যদি আশানুরূপ ফলন না পায় তাহলে তাদের যেমন ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি হয়। কিন্তু এর একটি বিশাল প্রভাব আমাদের খাদ্য মজুদেও পড়বে।
“আমরা যদি খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করতে পারি তাহলে তা আমাদের স্থানীয় অভাব মেটানোও সম্ভব হবে না।”
মিজানুর রহমান বলেন, “তিন বছরে একবার ডলোচুন বা গোড়া চুন ব্যবহার করলে ভাল। এতে সারেরও গুণাগুণ বাড়বে এবং মাটিতে সারের গুণাগুণ বাড়বে।
“এ ছাড়া সালফার জাতীয় সারের যদি আধিক্য বাড়ায় তাতেও কিন্তু সালফার আয়ন ও ম্যাগনেসিয়াম আয়নের আধিক্য বাড়ে। যার কারণে এই এসিডিটি কমে আসবে।”
তবে জৈব সার প্রয়োগে জোর দিয়ে তিনি বলেন, জৈব সার মাটির প্রাণ। জৈব সার যদি না পাওয়া যায়, মাটিতে যদি উপকারী অণুজীব না থাকে- সে ক্ষেত্রে মাটি স্বাভাবিক পর্যায়ে আসা কঠিন।”
“অন্যদিকে আমাদের মাটির টপ সয়েল বা উপরিভাগও বাঁচাতে হবে। তাহলে কৃষক বাঁচবে। না হয় ফলন কমে- জাতীয়ভাবে আমরা ক্ষতির মুখোমুখি হবো।”
সূত্র:বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম




আপনার মতামত লিখুন
Array